ঢাকা ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভাঙ্গনে নিস্ব হচ্ছে শ্রীপুরের শত শত পরিবার, আশ্বাসে সীমাবদ্ধ প্রতিরোধ

  • স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ১০:৪৭:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জুলাই ২০২৩
  • ২২৬ খবরটি দেখা হয়েছে

কয়েক বছরের ভাঙ্গনে নিস্ব হয়েছেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের শত শত পরিবার। শেষ আশ্রয়টুকো হারিয়ে এখন তারা পুরো নিস্ব। জনপ্রতিনিধিরা বার বার ভাঙ্গরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবে রুপ নেই। ভাঙ্গন কবলিত এলাকার লোকজন কোন আর্থিত সহায়তা কিংবা তারা দয়া চাননা। সরকারের কাছে তাদের দাবী বসতভিটা রক্ষায় যেন নেয়া হয় কার্যকরী পদক্ষেপ। ভাঙ্গন প্রতিরোধে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গতকাল নদীরপাড়ে মানববন্ধন করেছে কালাবদর ও তেতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে নিস্ব এলাকাবাসী।

এসময় তাদের সবার চোখে ছিলো অশ্রু। বারবার মিডিয়া কর্মীদের নিকট অনুরোধ জানাচ্ছিলেন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করে যত দ্রুত সম্ভব নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন। আর নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে গতকাল বুধবার বেলা ১২টায় ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় মানববন্ধন এবং দোয়া মোনাজাত করেন গ্রামবাসী। একই সাথে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

সরেজমিনে শ্রীপুর গিয়ে দেখা যায় তেতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করছেন এলাকাবাসী। মানববন্ধন চলাকালে গ্রামবাসী বক্তৃতায় মিডিয়া কর্মীদের নিকট প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষনের অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি দিলেই এ ভাঙ্গন থেকে তাদের পরিত্রান মিলবে। একই সময় মানববন্ধনের পিছন থেকে ঘরবাড়ি সরানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন শ্রীপুর গ্রামবাসী। একদিকে ঘর ভেঙ্গে নতুনভাবে কাঠামো করা হচ্ছে।

সেই কাঠামো আবার ট্রলারে তুলে অন্যত্র যাচ্ছে ঘর তুলতে। সেই সাথে বাগানের গাছও কেটে নিচ্ছে। পরে থাকছে বসত ঘরের ভিটা। কেউ আবার ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছে। ভাঙ্গন কাছে চলে আসলে আবার ঝুপড়ি ঘর সরিয়ে নেন। ভাঙ্গনের সাথে যুদ্ধ করে চলছে ওই ইউনিয়নবাসীর বসবাস। মানববন্ধন শেষে বরিশাল এসে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে স্মারকলিপি প্রদান করেন গ্রামবাসী। দুই স্থান থেকে তাদের আশ্বাস দেয়া হয় ভাঙ্গন প্রতিরোধে। কিন্তু ভাঙ্গনকবলিত মানুষগুলো এখন আর আশ্বাস চান না, তারা চান ভাঙ্গন প্রতিরোধ।

গেল সাত বছর ধরে এ ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলেও কোন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহন না করায় প্রতি বছর চার থেকে সাড়ে চারশ’ ঘর বিলীন হয়েছে। উচ্চ, মধ্য ও নিম্মবিত্ত থেকে হতদরিদ্রদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন হাজার হাজার পরিবার। তারা বিভিন্ন গ্রামবাসীর জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছেন। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারগুলোর চোখের পানি ছাড়া আর কিছু নেই। তাদের একটাই দাবি নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহনের। কথাগুলো বলছিলেন ওই এলাকার বাসিন্দা মাহামুদ হাসান বেপারী। তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর ভাঙ্গন শুরু হলেই এমপি থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন দপ্তর থেকে কর্মকর্তারা এসে পরিদর্শন করে আশ্বাস দিয়ে ফিরে যান। সেই আশ্বাসে ভরসা রাখতে গিয়ে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়েছে।

তিনটি গ্রাম শ্রীপুর, মিয়ারচর ও বাহেরচরের অধিকাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে শ্রীপুর, মিয়ারচর, বাহেরচর, চর ফেনুয়া, চরবগি ও চরমহিষা। গত এক মাসের ব্যবধানে ওই সকল গ্রামের বসত ঘর, বাগান বাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন ঘর ভেঙ্গে সরিয়ে নিচ্ছে গ্রামবাসী। ইউনুস জমাদ্দার বলেন, আগুন পুড়লে ভিটা থাকে। কিন্তু নদী ভাঙ্গনে পড়লে কিছুই থাকে না। গত সাত বছরের ব্যবধানে শ্রীপুরের বহু মানুষ সাত থেকে আটবার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছে। যাদের বাড়িতে কামলা ছিল তারাই এখন কামলা দিচ্ছে বিভিন্ন বাড়িতে। আর যারা কামলা দিতে লজ্জা পান তারা শহরমুখী হয়েছেন।

বহু গ্রামবাসী বসত ভিটা ও জমি হারিয়ে পথে বসেছে। অথচ সরকার থেকে দৃষ্টি দেয়া হলে ভাঙ্গনকবলিত লোকগুলোতে নিঃস্বের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতো। তিনি অভিযোগ করেন যখনই ভাঙ্গন শুরু হয়, তখনই পরিদর্শনের পর পরিদর্শন করেন জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা। সেই পরিদর্শন আর আলোর মুখ দেখে না। অথচ প্রথম পরিদর্শন আলোর মুখ দেখলে এ অবস্থায় পড়তে হতো না গ্রামবাসীকে। আমির হোসেন গাজী ও আবুল হোসেন সিকদার বলেন, বছরের পর বছর ভাঙ্গনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। এতে করে ভাঙ্গনকবলিত পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে শ্রীপুরের একমাত্র মহিষা ওয়াহিদা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। ওই বিদ্যালয়টি কোনভাবে নদীগর্ভে বিলীন হলে পঞ্চম শ্রেণির পর আর লেখাপড়ার সুযোগ থাকবে না।

তাছাড়া বাহেরচর ফেনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, শ্রীপুর ইউনিয়ন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিতসহ নদী ভাঙ্গন রোধে সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। ভাঙ্গন প্রতিরোধ যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে হয় তার ব্যবস্থাও করা হবে।

ট্যাগ :

খুলনার দাকোপে ভূমিসেবা সপ্তাহ উদযাপন হয়েছে

ভাঙ্গনে নিস্ব হচ্ছে শ্রীপুরের শত শত পরিবার, আশ্বাসে সীমাবদ্ধ প্রতিরোধ

আপডেট সময় : ১০:৪৭:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জুলাই ২০২৩

কয়েক বছরের ভাঙ্গনে নিস্ব হয়েছেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের শত শত পরিবার। শেষ আশ্রয়টুকো হারিয়ে এখন তারা পুরো নিস্ব। জনপ্রতিনিধিরা বার বার ভাঙ্গরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবে রুপ নেই। ভাঙ্গন কবলিত এলাকার লোকজন কোন আর্থিত সহায়তা কিংবা তারা দয়া চাননা। সরকারের কাছে তাদের দাবী বসতভিটা রক্ষায় যেন নেয়া হয় কার্যকরী পদক্ষেপ। ভাঙ্গন প্রতিরোধে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গতকাল নদীরপাড়ে মানববন্ধন করেছে কালাবদর ও তেতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে নিস্ব এলাকাবাসী।

এসময় তাদের সবার চোখে ছিলো অশ্রু। বারবার মিডিয়া কর্মীদের নিকট অনুরোধ জানাচ্ছিলেন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করে যত দ্রুত সম্ভব নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন। আর নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে গতকাল বুধবার বেলা ১২টায় ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় মানববন্ধন এবং দোয়া মোনাজাত করেন গ্রামবাসী। একই সাথে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

সরেজমিনে শ্রীপুর গিয়ে দেখা যায় তেতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করছেন এলাকাবাসী। মানববন্ধন চলাকালে গ্রামবাসী বক্তৃতায় মিডিয়া কর্মীদের নিকট প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষনের অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি দিলেই এ ভাঙ্গন থেকে তাদের পরিত্রান মিলবে। একই সময় মানববন্ধনের পিছন থেকে ঘরবাড়ি সরানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন শ্রীপুর গ্রামবাসী। একদিকে ঘর ভেঙ্গে নতুনভাবে কাঠামো করা হচ্ছে।

সেই কাঠামো আবার ট্রলারে তুলে অন্যত্র যাচ্ছে ঘর তুলতে। সেই সাথে বাগানের গাছও কেটে নিচ্ছে। পরে থাকছে বসত ঘরের ভিটা। কেউ আবার ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছে। ভাঙ্গন কাছে চলে আসলে আবার ঝুপড়ি ঘর সরিয়ে নেন। ভাঙ্গনের সাথে যুদ্ধ করে চলছে ওই ইউনিয়নবাসীর বসবাস। মানববন্ধন শেষে বরিশাল এসে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে স্মারকলিপি প্রদান করেন গ্রামবাসী। দুই স্থান থেকে তাদের আশ্বাস দেয়া হয় ভাঙ্গন প্রতিরোধে। কিন্তু ভাঙ্গনকবলিত মানুষগুলো এখন আর আশ্বাস চান না, তারা চান ভাঙ্গন প্রতিরোধ।

গেল সাত বছর ধরে এ ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলেও কোন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহন না করায় প্রতি বছর চার থেকে সাড়ে চারশ’ ঘর বিলীন হয়েছে। উচ্চ, মধ্য ও নিম্মবিত্ত থেকে হতদরিদ্রদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন হাজার হাজার পরিবার। তারা বিভিন্ন গ্রামবাসীর জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছেন। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারগুলোর চোখের পানি ছাড়া আর কিছু নেই। তাদের একটাই দাবি নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহনের। কথাগুলো বলছিলেন ওই এলাকার বাসিন্দা মাহামুদ হাসান বেপারী। তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর ভাঙ্গন শুরু হলেই এমপি থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন দপ্তর থেকে কর্মকর্তারা এসে পরিদর্শন করে আশ্বাস দিয়ে ফিরে যান। সেই আশ্বাসে ভরসা রাখতে গিয়ে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়েছে।

তিনটি গ্রাম শ্রীপুর, মিয়ারচর ও বাহেরচরের অধিকাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে শ্রীপুর, মিয়ারচর, বাহেরচর, চর ফেনুয়া, চরবগি ও চরমহিষা। গত এক মাসের ব্যবধানে ওই সকল গ্রামের বসত ঘর, বাগান বাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন ঘর ভেঙ্গে সরিয়ে নিচ্ছে গ্রামবাসী। ইউনুস জমাদ্দার বলেন, আগুন পুড়লে ভিটা থাকে। কিন্তু নদী ভাঙ্গনে পড়লে কিছুই থাকে না। গত সাত বছরের ব্যবধানে শ্রীপুরের বহু মানুষ সাত থেকে আটবার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছে। যাদের বাড়িতে কামলা ছিল তারাই এখন কামলা দিচ্ছে বিভিন্ন বাড়িতে। আর যারা কামলা দিতে লজ্জা পান তারা শহরমুখী হয়েছেন।

বহু গ্রামবাসী বসত ভিটা ও জমি হারিয়ে পথে বসেছে। অথচ সরকার থেকে দৃষ্টি দেয়া হলে ভাঙ্গনকবলিত লোকগুলোতে নিঃস্বের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতো। তিনি অভিযোগ করেন যখনই ভাঙ্গন শুরু হয়, তখনই পরিদর্শনের পর পরিদর্শন করেন জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা। সেই পরিদর্শন আর আলোর মুখ দেখে না। অথচ প্রথম পরিদর্শন আলোর মুখ দেখলে এ অবস্থায় পড়তে হতো না গ্রামবাসীকে। আমির হোসেন গাজী ও আবুল হোসেন সিকদার বলেন, বছরের পর বছর ভাঙ্গনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। এতে করে ভাঙ্গনকবলিত পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে শ্রীপুরের একমাত্র মহিষা ওয়াহিদা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। ওই বিদ্যালয়টি কোনভাবে নদীগর্ভে বিলীন হলে পঞ্চম শ্রেণির পর আর লেখাপড়ার সুযোগ থাকবে না।

তাছাড়া বাহেরচর ফেনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, শ্রীপুর ইউনিয়ন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিতসহ নদী ভাঙ্গন রোধে সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। ভাঙ্গন প্রতিরোধ যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে হয় তার ব্যবস্থাও করা হবে।