ঢাকা ০৫:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বরিশাল সিটির নতুন মেয়র খোকনের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

যে কারণে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত করা হয়েছে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে। সেই নবনির্বাচিত মেয়রকে আগামীদিনে অনেক বিড়ম্বনা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে নাগরিক সেবা নিশ্চিতসহ নগরীর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। ফলে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে নতুন মেয়রকে।

নগর ভবনকে দুর্নীতিমুক্ত ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে নির্বাচনের আগে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেসব বিষয় তাকে বিবেচনায় রেখেই আগামীদিনে দায়িত্ব পালনে তাগিদ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণে নবনির্বাচিত মেয়রের সততা ও আন্তরিকতার যেমন বিকল্প নেই, তেমনি তাকে রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে সব এলাকা ও নাগরিকের মেয়র হিসেব কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন ওই মহলটি।

সূত্রের দাবি, বরিশাল মহানগরীর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করণে নতুন মেয়রকে সবকিছুর অগে নগর ভবনে শৃঙ্খলা, সততা ও আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গত কয়েকবছরে কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী নগর ভবনকে নাগরিক সেবার পরিবর্তে নিপীড়নের সূতিকাগারে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করাসহ ওএসডির নামে আরও বিপুলসংখ্যক কর্মীর বেতন-ভাতা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার অনেককে মাসের পর মাস অফিসে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ওইসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনেক দক্ষ ও আন্তরিক কর্মী থাকলেও তাদের সেবা থেকে নগরবাসী বঞ্চিত হয়েছেন।

নগর ভবনের চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নাগরিক সেবা যেমনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তেমনি প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলারও চরম অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পরিসেবার দায়িত্বে কর্মকর্তার পরিবর্তে কর্মচারীদের দিয়ে কাজ করাতে গিয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এমনকি নগর ভবনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণগত সমস্যা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছিল যে, অনেকেই অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নগর ভবনের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতেন না।

ফলে অতীতে সম্পূর্ণ খামখেয়ালিভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করাসহ ওএসডিতে রাখা দক্ষ ও আন্তরিক কর্মীদের চাকরিতে পুনর্বহাল করে নাগরিক সেবা নিশ্চিতের দাবি করেছেন সচেতন নগরবাসী।

সূত্রমতে, নগরীতে বাড়ির প্ল্যান অনুমোদন অত্যন্ত দুর্বিসহ যন্ত্রণা আর আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে গত কয়েক বছরে। বিধি বহির্ভূতভাবে নগরবাসীর ওপর অতিরিক্ত ফি চাঁপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি, লাগাতার হয়রানির কারণে অনেকেই বর্তমান নগর পরিষদের মেয়াদে বাড়ি করার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে ওইসব ভুক্তভোগীরা সদ্যসমাপ্ত সিটি নির্বাচনে বর্তমান মেয়র দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় হাঁফ ছাড়েন।

পরবর্তীতে নতুন মনোনয়ন পাওয়া খোকন সেরনিয়াবাতকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত করতে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে ভুক্তভোগীরা উন্নয়নের পক্ষে ও নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে গত ১২ জুন ভোটের মাঠে চমক দেখিয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল মহানগরীতে সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। গোটা নগরীজুড়ে অবৈধ ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিক্সা, বিকট গর্জনের থ্রি-হুইলার দাপিয়ে বেড়ালেও বেশিরভাগ যানবাহনের লাইসেন্স নেই। ইতোপূর্বে এ নগরীতে সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সকৃত ১২ হাজার প্যাডেল চালিত রিক্সা ও আড়াই হাজার ইজিবাইক চলাচলের অনুমতি থাকলেও নগর ভবনের উদাসীনতায় গত কয়েকবছরে এসব যাবাহনের লাইসেন্স প্রদানের বিধান উধাও হয়ে গেছে। ফলে নগরীজুড়ে এখন হাজার হাজার অবৈধ যানবাহন নগরবাসীর দুর্ঘটনার আতঙ্ক বৃদ্ধি করেছে।

সচেতন নগরবাসীর দাবি, ৫৮ বর্গকিলোমিটারের এ নগরীতে প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার ড্রেনের বেশিরভাগই নিয়মিত পরিষ্কার হচ্ছে না। ফলে ঘণ্টায় পাঁচ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে নগরীর বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। নগরীর পাকা ড্রেনগুলোর চেয়েও আরও করুণ অবস্থা খালগুলোর। নগরীর সাতটি খাল খননে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের পর পানি উন্নয়ন বোর্ড দরপত্র আহ্বান করলেও নগর ভবনের বাঁধার মুখে আর কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। যদিও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব) জাহিদ ফারুক শামীম ঘোষণা করেছেন সেই দরপত্র বাতিল করে নতুন প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। নবনির্বাচিত সিটি মেয়রের মাধ্যমে সবগুলো খাল শীঘ্রই খনন করা হবে।

সূত্রের দাবি, নগরীর প্রধান কয়েকটি রাস্তা ফিটফাট থাকলেও বিভিন্ন গলি ও নগরীর পার্শ¦বর্তী ওয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো করুণ অবস্থায় রয়েছে। নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বেশিরভাগ জনগুরুত্বপূর্ণ পরিসেবাই বিপর্যস্তকর অবস্থায় রয়েছে। বিভাগীয় শহর বরিশাল নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও মানসম্মততো দূরের কথা, লাগসই বা পরিবেশ অনুকূল ব্যবস্থায় নেওয়ার লক্ষ্যে তেমন কোন কর্ম পরিকল্পনা পর্যন্ত নেই। দীর্ঘদিনের পুরনো ‘ময়লা খোলা’ এলাকায় প্রতিদিন তিন শতাধিক টন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা মোটেই স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব নয় বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের বকেয়া রয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। গত এক বছরে দুই দফায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ‘ওজোপাডিকো’ নগরীর বিভিন্ন সড়ক বাতির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও নগর ভবন থেকে বকেয়া পরিশোধে নেই কোনো উদ্যোগ। বিষয়টি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরেও রয়েছে। কিন্তু নগর ভবন থেকে বকেয়া পরিশোধতো দূরের কথা, চলতি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধেও ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

বিশুদ্ধ পানি সমস্যা সমাধানে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে বরিশাল নগরীতে দুইটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও প্রায় ৫০ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সরকারের প্রয় ৩২ কোটি টাকার নিজস্ব তহবিলের ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয় ২০১৮-১৯ সালে। কিন্তু সরকারি বিপুল অর্থ ব্যয়ের সেই প্রকল্পের সুফল এ নগরবাসী আর পায়নি। ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দুইটি মুখ থুবড়ে পরে রয়েছে।

এসব বিরুপ পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ৩ জুলাই সদ্যসমাপ্ত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র এবং কাউন্সিলরদের শপথ গ্রহণ করানো হবে। ওইদিন গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী কাউন্সিলরদের শপথ করাবেন। শপথ গ্রহণের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য ও নির্বাচিত সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার।

সূত্রমতে, শপথ গ্রহণের পর মেয়র নগর ভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করে নগর পরিষদের প্রথম সাধারণ সভা করবেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম সাধারণ সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর নগর পরিষদের মেয়াদ থাকে।

সার্বিক বিষয়ে নবনির্বাচিত সিটি মেয়র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, আমার ও বরিশালবাসীর একমাত্র অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় সর্বস্তরের নগরবাসীর মতামতের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে একটি নতুন বরিশাল গড়াই হচ্ছে আমার নির্বাচনী ওয়াদা। ইনশআল্লাহ আমি আমার ওয়াদা পালন করব।

তিনি আরও বলেন, দুর্নীতিমুক্ত ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে সর্বস্তরের নগরবাসীকে নগর ভবনমুখী করা হবে। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে আমি যেসব প্রতিশ্রুতি কিংবা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছি, অবশ্যই আমি নগরবাসীর মতামতের ভিত্তিতে তা পূরণ করতে বদ্ধপরিকর।

খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, দেশের প্রতিটি উন্নয়ন মানেই শেখ হাসিনা। তাই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় আমাদের একমাত্র অভিভাবক শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচিত করা হলেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করণে সততা ও আন্তরিকতার প্রশ্নে নবনির্বাচিত সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, আমি আগেই ঘোষণা দিয়েছি, নগরবাসীর প্রয়োজনে আমার দরজা ২৪ ঘণ্টা খোলা। সেখানে সবদলের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের ১২৬টি ভোট কেন্দ্র থেকেই আমাকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডেই চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে। আর সততা সেটা আমি মুখে নয়, কাজে প্রমাণ করে দেব।

ট্যাগ :

দাকোপের বাজুয়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন

বরিশাল সিটির নতুন মেয়র খোকনের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ১২:২৬:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জুন ২০২৩

যে কারণে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত করা হয়েছে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে। সেই নবনির্বাচিত মেয়রকে আগামীদিনে অনেক বিড়ম্বনা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে নাগরিক সেবা নিশ্চিতসহ নগরীর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। ফলে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে নতুন মেয়রকে।

নগর ভবনকে দুর্নীতিমুক্ত ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে নির্বাচনের আগে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেসব বিষয় তাকে বিবেচনায় রেখেই আগামীদিনে দায়িত্ব পালনে তাগিদ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণে নবনির্বাচিত মেয়রের সততা ও আন্তরিকতার যেমন বিকল্প নেই, তেমনি তাকে রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে সব এলাকা ও নাগরিকের মেয়র হিসেব কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন ওই মহলটি।

সূত্রের দাবি, বরিশাল মহানগরীর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করণে নতুন মেয়রকে সবকিছুর অগে নগর ভবনে শৃঙ্খলা, সততা ও আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গত কয়েকবছরে কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী নগর ভবনকে নাগরিক সেবার পরিবর্তে নিপীড়নের সূতিকাগারে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করাসহ ওএসডির নামে আরও বিপুলসংখ্যক কর্মীর বেতন-ভাতা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার অনেককে মাসের পর মাস অফিসে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ওইসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনেক দক্ষ ও আন্তরিক কর্মী থাকলেও তাদের সেবা থেকে নগরবাসী বঞ্চিত হয়েছেন।

নগর ভবনের চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নাগরিক সেবা যেমনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তেমনি প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলারও চরম অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পরিসেবার দায়িত্বে কর্মকর্তার পরিবর্তে কর্মচারীদের দিয়ে কাজ করাতে গিয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এমনকি নগর ভবনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণগত সমস্যা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছিল যে, অনেকেই অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নগর ভবনের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতেন না।

ফলে অতীতে সম্পূর্ণ খামখেয়ালিভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করাসহ ওএসডিতে রাখা দক্ষ ও আন্তরিক কর্মীদের চাকরিতে পুনর্বহাল করে নাগরিক সেবা নিশ্চিতের দাবি করেছেন সচেতন নগরবাসী।

সূত্রমতে, নগরীতে বাড়ির প্ল্যান অনুমোদন অত্যন্ত দুর্বিসহ যন্ত্রণা আর আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে গত কয়েক বছরে। বিধি বহির্ভূতভাবে নগরবাসীর ওপর অতিরিক্ত ফি চাঁপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি, লাগাতার হয়রানির কারণে অনেকেই বর্তমান নগর পরিষদের মেয়াদে বাড়ি করার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে ওইসব ভুক্তভোগীরা সদ্যসমাপ্ত সিটি নির্বাচনে বর্তমান মেয়র দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় হাঁফ ছাড়েন।

পরবর্তীতে নতুন মনোনয়ন পাওয়া খোকন সেরনিয়াবাতকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত করতে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে ভুক্তভোগীরা উন্নয়নের পক্ষে ও নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে গত ১২ জুন ভোটের মাঠে চমক দেখিয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল মহানগরীতে সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। গোটা নগরীজুড়ে অবৈধ ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিক্সা, বিকট গর্জনের থ্রি-হুইলার দাপিয়ে বেড়ালেও বেশিরভাগ যানবাহনের লাইসেন্স নেই। ইতোপূর্বে এ নগরীতে সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সকৃত ১২ হাজার প্যাডেল চালিত রিক্সা ও আড়াই হাজার ইজিবাইক চলাচলের অনুমতি থাকলেও নগর ভবনের উদাসীনতায় গত কয়েকবছরে এসব যাবাহনের লাইসেন্স প্রদানের বিধান উধাও হয়ে গেছে। ফলে নগরীজুড়ে এখন হাজার হাজার অবৈধ যানবাহন নগরবাসীর দুর্ঘটনার আতঙ্ক বৃদ্ধি করেছে।

সচেতন নগরবাসীর দাবি, ৫৮ বর্গকিলোমিটারের এ নগরীতে প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার ড্রেনের বেশিরভাগই নিয়মিত পরিষ্কার হচ্ছে না। ফলে ঘণ্টায় পাঁচ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে নগরীর বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। নগরীর পাকা ড্রেনগুলোর চেয়েও আরও করুণ অবস্থা খালগুলোর। নগরীর সাতটি খাল খননে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের পর পানি উন্নয়ন বোর্ড দরপত্র আহ্বান করলেও নগর ভবনের বাঁধার মুখে আর কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। যদিও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব) জাহিদ ফারুক শামীম ঘোষণা করেছেন সেই দরপত্র বাতিল করে নতুন প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। নবনির্বাচিত সিটি মেয়রের মাধ্যমে সবগুলো খাল শীঘ্রই খনন করা হবে।

সূত্রের দাবি, নগরীর প্রধান কয়েকটি রাস্তা ফিটফাট থাকলেও বিভিন্ন গলি ও নগরীর পার্শ¦বর্তী ওয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো করুণ অবস্থায় রয়েছে। নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বেশিরভাগ জনগুরুত্বপূর্ণ পরিসেবাই বিপর্যস্তকর অবস্থায় রয়েছে। বিভাগীয় শহর বরিশাল নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও মানসম্মততো দূরের কথা, লাগসই বা পরিবেশ অনুকূল ব্যবস্থায় নেওয়ার লক্ষ্যে তেমন কোন কর্ম পরিকল্পনা পর্যন্ত নেই। দীর্ঘদিনের পুরনো ‘ময়লা খোলা’ এলাকায় প্রতিদিন তিন শতাধিক টন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা মোটেই স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব নয় বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের বকেয়া রয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। গত এক বছরে দুই দফায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ‘ওজোপাডিকো’ নগরীর বিভিন্ন সড়ক বাতির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও নগর ভবন থেকে বকেয়া পরিশোধে নেই কোনো উদ্যোগ। বিষয়টি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরেও রয়েছে। কিন্তু নগর ভবন থেকে বকেয়া পরিশোধতো দূরের কথা, চলতি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধেও ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

বিশুদ্ধ পানি সমস্যা সমাধানে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে বরিশাল নগরীতে দুইটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও প্রায় ৫০ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সরকারের প্রয় ৩২ কোটি টাকার নিজস্ব তহবিলের ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয় ২০১৮-১৯ সালে। কিন্তু সরকারি বিপুল অর্থ ব্যয়ের সেই প্রকল্পের সুফল এ নগরবাসী আর পায়নি। ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দুইটি মুখ থুবড়ে পরে রয়েছে।

এসব বিরুপ পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ৩ জুলাই সদ্যসমাপ্ত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র এবং কাউন্সিলরদের শপথ গ্রহণ করানো হবে। ওইদিন গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী কাউন্সিলরদের শপথ করাবেন। শপথ গ্রহণের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য ও নির্বাচিত সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার।

সূত্রমতে, শপথ গ্রহণের পর মেয়র নগর ভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করে নগর পরিষদের প্রথম সাধারণ সভা করবেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম সাধারণ সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর নগর পরিষদের মেয়াদ থাকে।

সার্বিক বিষয়ে নবনির্বাচিত সিটি মেয়র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, আমার ও বরিশালবাসীর একমাত্র অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় সর্বস্তরের নগরবাসীর মতামতের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে একটি নতুন বরিশাল গড়াই হচ্ছে আমার নির্বাচনী ওয়াদা। ইনশআল্লাহ আমি আমার ওয়াদা পালন করব।

তিনি আরও বলেন, দুর্নীতিমুক্ত ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে সর্বস্তরের নগরবাসীকে নগর ভবনমুখী করা হবে। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে আমি যেসব প্রতিশ্রুতি কিংবা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছি, অবশ্যই আমি নগরবাসীর মতামতের ভিত্তিতে তা পূরণ করতে বদ্ধপরিকর।

খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, দেশের প্রতিটি উন্নয়ন মানেই শেখ হাসিনা। তাই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় আমাদের একমাত্র অভিভাবক শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচিত করা হলেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করণে সততা ও আন্তরিকতার প্রশ্নে নবনির্বাচিত সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, আমি আগেই ঘোষণা দিয়েছি, নগরবাসীর প্রয়োজনে আমার দরজা ২৪ ঘণ্টা খোলা। সেখানে সবদলের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের ১২৬টি ভোট কেন্দ্র থেকেই আমাকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডেই চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে। আর সততা সেটা আমি মুখে নয়, কাজে প্রমাণ করে দেব।