ঢাকা ০২:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

“সড়ক দুর্ঘটনা” এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না

  • স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৮:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুলাই ২০২৩
  • ৬২ খবরটি দেখা হয়েছে

জন্মিলে মৃত্যুবরণ করতে হবে এটি চিরায়ত নিয়ম। তাই বলে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের করুণ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুকে হত্যা বলা যায়।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য প্রথমত, দেশে একটি স্বচ্ছ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা থাকা অত্যন্ত জরুরি। সড়ক, রেলপথ, নদীপথ, আকাশপথ ও সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য বিশ্বমানের নীতিমালা ও আইনগত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না করার কারণেই সমস্যা দিনে দিনে গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কাঁচা-পাকা রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ, কালভার্ট, খাল ও নদীনালা খনন ইত্যাদি পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে না করায় সেগুলো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক নির্মাণে সীমাহীন অব্যবস্থাপনা-সমন্বয়হীনতা, সড়কের পাশ কম হওয়া, সড়ক নির্মাণে নিুমানের সামগ্রী ব্যবহার করা- সবকিছুতেই দায়িত্বহীনতার নজির দেখা যায়। যাদের ওপর এ দায়িত্ব- সরকারের মন্ত্রী, সচিব, উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা ও ঠিকাদারসহ মিলে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে থাকে।

সড়ক ব্যবস্থাপনায় অপচয় রোধ করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। কে কত কমিশন পাবে তাই নিয়েই তারা ব্যস্ত। দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য ভাবার সময় তাদের নেই।

সড়ক নির্মাণে ভুলের কারণে কত মূল্যবান জীবন অকালে ঝরে যায়, তা নিয়ে ভাবার কোনো লোক আছে বলে মনে হয় না। ভাবটা শুধু এমন- আমি ও আমার পরিবার ভালো থাকলেই হল, অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই।

অবৈধ অর্থের দিকে দুর্বার গতিতে ছুটে চলার নেশায় ন্যায়-অন্যায়, বিবেক-বিবেচনা, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ ও জবাবদিহিতা কোনো কিছুরই প্রয়োজবোধ আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় আছে বলে মনে হয় না। নৌপথের দুর্ঘটনা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে তা গা সওয়ার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।

ছোট-বড় লঞ্চ নির্মাণে সীমাহীন ত্রুটি দুর্ঘটনার পরে আবিষ্কৃত হয়। তদন্ত টিম হয়; কিন্তু রিপোর্ট আলোর মুখ না দেখার নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রকৃতিগত পরিবর্তনের শিকার হয়ে ও ভারতের নিজস্ব স্বার্থের কারণে বাংলাদেশের নদীপথের মৃতপ্রায় অবস্থা এখন, সেই সঙ্গে এক শ্রেণীর মানুষের ক্ষমতার দাপটে নদী দখল সব সরকারের আমলেই কমবেশি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ।

নদীর বালু আজ শিল্পে পরিণত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ডিসির পারমিশনের কথা বলে স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সহায়তায় নিজেদের ভাগ্য গড়লেও সরকারি আইন অনুযায়ী বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা নানা ছলচাতুরী ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থোড়াই কেয়ার করে চলেছে প্রতিনিয়তই।

অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত দুর্বল মানুষরা প্রতিবাদ করার সাহস ও শক্তি পায় না। নানা ভয়ভীতি ও হয়রানি থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে নীরবে সব ক্ষতি মেনে নেয়। ভোটের সময় ঠিকই তারা উপযুক্ত জবাব দেয়। প্রতিটি নির্বাচনেই জনগণ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখে। কিছু লোকের কারণে মানুষ এমন হতে বাধ্য হয়। দুর্নীতিবাজ এ মানুষগুলোকে প্রতিহত করা সময়ের দাবি।

রেলপথ অতীতের চেয়ে অনেক উন্নত হলেও আরও ভালো এবং নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতির কারণে যানজট-জলজটে ঢাকা-সিলেট-বরিশাল ও চট্টগ্রামের মতো অনেক শহর একটু ভারি বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে যায়। ফলে মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না।

আমরা কতটা অনিয়মতান্ত্রিক পথে জীবনযাপন করি, নিজের বিবেক আর কবে জাগ্রত হবে! এ ঘটনায় আমাদের কোনো শিক্ষা হল কিনা, জানি না।
প্রশাসন রাজনৈতিক সংগঠনকে তাদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে চায় ও কোনো কোনো জায়গায় করে থাকে। যার যে কাজ করার কথা, সে কাজ না করে অন্যের কাজের ওপর মাতবরি করলে নিজের কাজ ও অন্যের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা যায় না। তাতে বিশৃঙ্খলা বাড়ে বৈ কমে না।

বিআরটিএ সংস্থাটি এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত যে, মন্ত্রী বারে বারে হঠাৎ করে অফিসে উপস্থিত হয়ে নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, গাড়ির সব কাগজপত্র নিয়ে কত ধরনের কারসাজি! পরিবহন মালিকদের অর্থ লিপ্সা এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা কত নামে চাঁদা তোলে, তার যেন শেষ নেই।

একই ব্যক্তি এমপি, মন্ত্রী ও পরিবহনের বড় নেতা। অনেক আগে থেকেই এ চর্চা হয়ে আসছে। তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এত বিশাল যে, সরকারও মাঝে মাঝে অসহায় হয়ে পড়ে। দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তা-ভাবনার ফলে সমাজের আজ এ অবস্থা।

সড়ক দুর্ঘটনা সারা পৃথিবীতে হয় এবং হবেও। তারপরও তা যত কমিয়ে রাখা যায়, সে জন্যই আইন, নিয়মকানুন, বিধিবিধান সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হওয়া দরকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের খুবই জরুরি।

রাস্তা নির্মাণে ইঞ্জিনিয়ার-ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়, অন্তত ৫ বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। সংশ্লিষ্ট দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিক সিগন্যাল বাতি দ্বারা পরিচালিত হতে হবে।

সব রাস্তায় স্পিড কন্ট্রোল রাখার জন্য অটো ক্যামেরা বসানো থাকলে গাড়ির নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি গতি হলে জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার রিসিট পৌঁছে যাবে গাড়ির মালিকের নির্দিষ্ট ঠিকানায়।

নির্ধারিত সময়ে জরিমানার টাকা প্রদান না করলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য টাকার পরিমাণ প্রতি সপ্তাহে বাড়তে থাকবে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি ও সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে, আয় বাড়বে, আইন মানার প্রবণতা তৈরি হবে এবং পুলিশও সৎ থাকতে বাধ্য হবে। লাইসেন্স প্রদানের স্বচ্ছতা থাকা দরকার। আইন এবং এর প্রয়োগ সঠিক থাকলে এগুলো সম্ভব।

চালকের অপরাধ অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত যৌক্তিক শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে শাস্তি নির্ধারিত হবে। এক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া যেতে পারে। ড্রাইভারের পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থা থাকলে সে সব সময় সতর্ক থাকবে। প্রতিটি ছোট অপরাধের জন্য ১ পয়েন্ট কাটা যাবে।

সর্বোচ্চ ৫ পয়েন্ট কাটা গেলে তার লাইসেন্স বাতিল হবে। প্রতিটি ছোট অপরাধের জন্য ১ পয়েন্ট কাটা যাওয়ার ৩ মাস পর্যন্ত কোনো অপরাধ না করলে তার কর্তনকৃত নাম্বার ফেরত পাবে। এভাবে সর্বোচ্চ অপরাধের জন্য তার লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।

ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি শহরের প্রতিটি রাস্তায় পথচারীদের চলাচলের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই। রোড ডিভাইডার আধুনিক হওয়া দরকার। ঢাকার গাড়ির সংখ্যা অনুপাতে রাস্তার লেন কম। ফলে বিভিন্ন গাড়ি একই লেনে চলার কারণে সমস্যা দেখা দেয়।

ইমার্জেন্সি লেন ব্যবহার আমাদের দেশে নেই। ফলে জরুরি রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও অগ্নিনির্বাপণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, দুর্ঘটনায় পতিত কোনো গাড়ি বা যাত্রীদের উদ্ধারের জন্য গাড়ির বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

ট্রাফিক ব্যবস্থা এখনও হাত তুলে নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, যা বর্তমান আধুনিক বিশ্বে অচল। আধুনিক সিগন্যাল বাতি ও ক্যামেরা সিস্টেম প্রচলন না হওয়া পর্যন্ত আইন অমান্য রোধ করা সম্ভব হবে না। ২৪ ঘণ্টাই আধুনিক সিগন্যাল সিস্টেম চালু থাকতে হবে।

ছোট-বড় রাস্তাসহ হাইওয়েতে। ডিজিটাল যুগে এনালগ সিস্টেম অচল। চিন্তার সঙ্গে কাজের সমন্বয় ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী দূরদর্শিতা দেখাতে না পারলে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। সেই কারণেই রাষ্ট্র ও নাগরিকদের জন্য যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা সরকারের একান্ত কর্তব্য।

প্রতিদিন সড়কে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা অতীব জরুরি। আজ ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলা থেকে ছেড়ে আসা বরিশালগামী বাসার স্মৃতি নামক বাসের ড্রাইভার চলন্ত বাসে মোবাইলে কথা বলার কারনে বাসটি ছত্তরকান্দা নামক এলাকায় সড়ক থেকে সিটকে পুকুরে পরে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। উক্ত গাড়িতে আমার ফুফাত ভাইর স্ত্রী এবং তার এসএসসি ফলপ্রার্থী কন্যা খুশবুও ছিলেন যারা নিহত হয়েছেন। আজ এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনা আমিসহ প্রায় সকল মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একে মৃত্যু না বলে হত্যা বলাই উচিত। ড্রাইভারের কারনে এমন হত্যা মেনে নেয়া যায় না কোনোভাবেই।

লেখকঃ মুহাম্মদ ইমাদুল হক প্রিন্স
সাহিত্যিক ও কলামিস্ট
ডেপুটি রেজিস্ট্রার
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ট্যাগ :

খুলনার দাকোপে ভূমিসেবা সপ্তাহ উদযাপন হয়েছে

“সড়ক দুর্ঘটনা” এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না

আপডেট সময় : ০৯:৪৮:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুলাই ২০২৩

জন্মিলে মৃত্যুবরণ করতে হবে এটি চিরায়ত নিয়ম। তাই বলে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের করুণ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুকে হত্যা বলা যায়।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য প্রথমত, দেশে একটি স্বচ্ছ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা থাকা অত্যন্ত জরুরি। সড়ক, রেলপথ, নদীপথ, আকাশপথ ও সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য বিশ্বমানের নীতিমালা ও আইনগত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না করার কারণেই সমস্যা দিনে দিনে গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কাঁচা-পাকা রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ, কালভার্ট, খাল ও নদীনালা খনন ইত্যাদি পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে না করায় সেগুলো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক নির্মাণে সীমাহীন অব্যবস্থাপনা-সমন্বয়হীনতা, সড়কের পাশ কম হওয়া, সড়ক নির্মাণে নিুমানের সামগ্রী ব্যবহার করা- সবকিছুতেই দায়িত্বহীনতার নজির দেখা যায়। যাদের ওপর এ দায়িত্ব- সরকারের মন্ত্রী, সচিব, উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা ও ঠিকাদারসহ মিলে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে থাকে।

সড়ক ব্যবস্থাপনায় অপচয় রোধ করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। কে কত কমিশন পাবে তাই নিয়েই তারা ব্যস্ত। দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য ভাবার সময় তাদের নেই।

সড়ক নির্মাণে ভুলের কারণে কত মূল্যবান জীবন অকালে ঝরে যায়, তা নিয়ে ভাবার কোনো লোক আছে বলে মনে হয় না। ভাবটা শুধু এমন- আমি ও আমার পরিবার ভালো থাকলেই হল, অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই।

অবৈধ অর্থের দিকে দুর্বার গতিতে ছুটে চলার নেশায় ন্যায়-অন্যায়, বিবেক-বিবেচনা, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ ও জবাবদিহিতা কোনো কিছুরই প্রয়োজবোধ আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় আছে বলে মনে হয় না। নৌপথের দুর্ঘটনা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে তা গা সওয়ার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।

ছোট-বড় লঞ্চ নির্মাণে সীমাহীন ত্রুটি দুর্ঘটনার পরে আবিষ্কৃত হয়। তদন্ত টিম হয়; কিন্তু রিপোর্ট আলোর মুখ না দেখার নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রকৃতিগত পরিবর্তনের শিকার হয়ে ও ভারতের নিজস্ব স্বার্থের কারণে বাংলাদেশের নদীপথের মৃতপ্রায় অবস্থা এখন, সেই সঙ্গে এক শ্রেণীর মানুষের ক্ষমতার দাপটে নদী দখল সব সরকারের আমলেই কমবেশি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ।

নদীর বালু আজ শিল্পে পরিণত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ডিসির পারমিশনের কথা বলে স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সহায়তায় নিজেদের ভাগ্য গড়লেও সরকারি আইন অনুযায়ী বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা নানা ছলচাতুরী ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থোড়াই কেয়ার করে চলেছে প্রতিনিয়তই।

অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত দুর্বল মানুষরা প্রতিবাদ করার সাহস ও শক্তি পায় না। নানা ভয়ভীতি ও হয়রানি থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে নীরবে সব ক্ষতি মেনে নেয়। ভোটের সময় ঠিকই তারা উপযুক্ত জবাব দেয়। প্রতিটি নির্বাচনেই জনগণ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখে। কিছু লোকের কারণে মানুষ এমন হতে বাধ্য হয়। দুর্নীতিবাজ এ মানুষগুলোকে প্রতিহত করা সময়ের দাবি।

রেলপথ অতীতের চেয়ে অনেক উন্নত হলেও আরও ভালো এবং নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতির কারণে যানজট-জলজটে ঢাকা-সিলেট-বরিশাল ও চট্টগ্রামের মতো অনেক শহর একটু ভারি বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে যায়। ফলে মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না।

আমরা কতটা অনিয়মতান্ত্রিক পথে জীবনযাপন করি, নিজের বিবেক আর কবে জাগ্রত হবে! এ ঘটনায় আমাদের কোনো শিক্ষা হল কিনা, জানি না।
প্রশাসন রাজনৈতিক সংগঠনকে তাদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে চায় ও কোনো কোনো জায়গায় করে থাকে। যার যে কাজ করার কথা, সে কাজ না করে অন্যের কাজের ওপর মাতবরি করলে নিজের কাজ ও অন্যের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা যায় না। তাতে বিশৃঙ্খলা বাড়ে বৈ কমে না।

বিআরটিএ সংস্থাটি এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত যে, মন্ত্রী বারে বারে হঠাৎ করে অফিসে উপস্থিত হয়ে নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, গাড়ির সব কাগজপত্র নিয়ে কত ধরনের কারসাজি! পরিবহন মালিকদের অর্থ লিপ্সা এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা কত নামে চাঁদা তোলে, তার যেন শেষ নেই।

একই ব্যক্তি এমপি, মন্ত্রী ও পরিবহনের বড় নেতা। অনেক আগে থেকেই এ চর্চা হয়ে আসছে। তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এত বিশাল যে, সরকারও মাঝে মাঝে অসহায় হয়ে পড়ে। দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তা-ভাবনার ফলে সমাজের আজ এ অবস্থা।

সড়ক দুর্ঘটনা সারা পৃথিবীতে হয় এবং হবেও। তারপরও তা যত কমিয়ে রাখা যায়, সে জন্যই আইন, নিয়মকানুন, বিধিবিধান সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হওয়া দরকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের খুবই জরুরি।

রাস্তা নির্মাণে ইঞ্জিনিয়ার-ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়, অন্তত ৫ বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। সংশ্লিষ্ট দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিক সিগন্যাল বাতি দ্বারা পরিচালিত হতে হবে।

সব রাস্তায় স্পিড কন্ট্রোল রাখার জন্য অটো ক্যামেরা বসানো থাকলে গাড়ির নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি গতি হলে জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার রিসিট পৌঁছে যাবে গাড়ির মালিকের নির্দিষ্ট ঠিকানায়।

নির্ধারিত সময়ে জরিমানার টাকা প্রদান না করলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য টাকার পরিমাণ প্রতি সপ্তাহে বাড়তে থাকবে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি ও সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে, আয় বাড়বে, আইন মানার প্রবণতা তৈরি হবে এবং পুলিশও সৎ থাকতে বাধ্য হবে। লাইসেন্স প্রদানের স্বচ্ছতা থাকা দরকার। আইন এবং এর প্রয়োগ সঠিক থাকলে এগুলো সম্ভব।

চালকের অপরাধ অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত যৌক্তিক শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে শাস্তি নির্ধারিত হবে। এক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া যেতে পারে। ড্রাইভারের পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থা থাকলে সে সব সময় সতর্ক থাকবে। প্রতিটি ছোট অপরাধের জন্য ১ পয়েন্ট কাটা যাবে।

সর্বোচ্চ ৫ পয়েন্ট কাটা গেলে তার লাইসেন্স বাতিল হবে। প্রতিটি ছোট অপরাধের জন্য ১ পয়েন্ট কাটা যাওয়ার ৩ মাস পর্যন্ত কোনো অপরাধ না করলে তার কর্তনকৃত নাম্বার ফেরত পাবে। এভাবে সর্বোচ্চ অপরাধের জন্য তার লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।

ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি শহরের প্রতিটি রাস্তায় পথচারীদের চলাচলের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই। রোড ডিভাইডার আধুনিক হওয়া দরকার। ঢাকার গাড়ির সংখ্যা অনুপাতে রাস্তার লেন কম। ফলে বিভিন্ন গাড়ি একই লেনে চলার কারণে সমস্যা দেখা দেয়।

ইমার্জেন্সি লেন ব্যবহার আমাদের দেশে নেই। ফলে জরুরি রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও অগ্নিনির্বাপণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, দুর্ঘটনায় পতিত কোনো গাড়ি বা যাত্রীদের উদ্ধারের জন্য গাড়ির বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

ট্রাফিক ব্যবস্থা এখনও হাত তুলে নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, যা বর্তমান আধুনিক বিশ্বে অচল। আধুনিক সিগন্যাল বাতি ও ক্যামেরা সিস্টেম প্রচলন না হওয়া পর্যন্ত আইন অমান্য রোধ করা সম্ভব হবে না। ২৪ ঘণ্টাই আধুনিক সিগন্যাল সিস্টেম চালু থাকতে হবে।

ছোট-বড় রাস্তাসহ হাইওয়েতে। ডিজিটাল যুগে এনালগ সিস্টেম অচল। চিন্তার সঙ্গে কাজের সমন্বয় ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী দূরদর্শিতা দেখাতে না পারলে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। সেই কারণেই রাষ্ট্র ও নাগরিকদের জন্য যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা সরকারের একান্ত কর্তব্য।

প্রতিদিন সড়কে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা অতীব জরুরি। আজ ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলা থেকে ছেড়ে আসা বরিশালগামী বাসার স্মৃতি নামক বাসের ড্রাইভার চলন্ত বাসে মোবাইলে কথা বলার কারনে বাসটি ছত্তরকান্দা নামক এলাকায় সড়ক থেকে সিটকে পুকুরে পরে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। উক্ত গাড়িতে আমার ফুফাত ভাইর স্ত্রী এবং তার এসএসসি ফলপ্রার্থী কন্যা খুশবুও ছিলেন যারা নিহত হয়েছেন। আজ এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনা আমিসহ প্রায় সকল মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একে মৃত্যু না বলে হত্যা বলাই উচিত। ড্রাইভারের কারনে এমন হত্যা মেনে নেয়া যায় না কোনোভাবেই।

লেখকঃ মুহাম্মদ ইমাদুল হক প্রিন্স
সাহিত্যিক ও কলামিস্ট
ডেপুটি রেজিস্ট্রার
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।